Madinatul Ulum Gakuin

一般社団法人マディーナトゥルウルーム学院 Madinatul Ulum Gakuin

15 Rabiul Awal, 1447 Hijri
Sunday, 7 September, 2025
Latest news:

হোম / সন্তান প্রতিপালন

সন্তানকে যেভাবে গড়ে তুলবেন

✍️ Sunnah

আপনার সন্তানকে যেভাবে গড়ে তুলবেন

পরিবার যেমন জীবন নির্মাণ ও গঠনের প্রথম পাঠশালা তেমনি 'মা'ও জীবনের প্রথম শিক্ষিকা। আচার-আচরণ, স্বভাব চরিত্র, রুচি ও মানসিকতা থেকে শুরু করে সমাজ-সভ্যতা, আদর্শ সংস্কৃতি পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেরই প্রথম দীক্ষা লাভ করে শিশুরা মায়ের কাছ থেকে। একারণেই এক মনীষী বলেছিলেন: তোমরা আমাকে একজন আদর্শ মা দাও, আমি তোমাদেরকে একটি আদর্শ সমাজ দেব।

শিশুরা দেখতে যেমন ফুলের মত নিষ্পাপ-বিধৌত তাদের ভেতরটাও থাকে তেমনি পবিত্র-আলোকিত। তাদের সামনে যা বলা হয়, সংঘটিত হয় যেসব ঘটনা তা তাদের হৃদয় পাতায় অংকিত হয়ে যায় খুবই সহজে। কারণ, তাদের হৃদয় থাকে পরিষ্কার উন্মুখ ও কিছু জানবার-পাবার প্রত্যাশায় সদা উৎসুক! তাই এই শূন্য পরিচ্ছন্ন হৃদয় আকাশে যা অংকিত অলংকৃত হয় জীবনে তা বিস্মৃত হয় না সহজে। যদি সত্য সুবাসিত সভ্যতার বীজ বপিত হয় এই সোনার ক্ষেতে তাহলে ভবিষ্যতে সোনাই ফলবে তার জীবন সাহারার পথে পথে। পক্ষান্তরে যদি এই উর্বর জমিতে রোপিত হয় অসভ্যতা, অসত্য ও অপসংস্কৃতির বিষদানা তাহলে এই বিষদানার বিষফল জীবনভর ভোগ করতে হবে তাকে, তার চারপাশের সকলকে। তাই নিজেদের স্বার্থে, মানব ও মানবতার স্বার্থেই প্রতিটি শিশুর হৃদয় ও চিন্তাকে উন্নত শিক্ষা, পরিশিলীত আদর্শ ও উত্তম চরিত্রগুণে পরিপূর্ণ আলোকিত, উজ্জীবিত ও প্রতিষ্ঠিত করে গড়ে তুলতে হবে এবং সর্ব প্রথম এই দায়িত্ব প্রতিটি মায়ের। কারণ, মায়ের আঁচলই এ বয়সের প্রথম ও সেরা আশ্রয়। ঘুরে-ফিরে এখানে এসেই সে আশ্রয় লয় বারবার, প্রতিবার। তাই প্রতিটি শিশুর সার্বিক গঠন ও নির্মাণের প্রধান দায়িত্ব মায়েরই। বিশেষ করে এই কারণেও, সবচাইতে অকৃত্রিম ঘনিষ্ঠজন হিসাবে তার দোষ-ত্রুটির বিকাশও বেশি ঘটে মায়ের সামনেই।তাই মায়ের পক্ষেই ওসব ত্রুটি-বিচ্যুতির যথার্থ নিরসন ও পরিশোধন করা সম্ভব।

যেভাবে ভাবতে হবে

প্রতিটি মায়েকে প্রথমেই ভাবতে হবে, তিনি তার সন্তানের শুধু মমতাময়ী জননীই নন। তিনি তার ভবিষ্যত-নির্মাতা শিক্ষিকাও বটে। তাই সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে স্থির করতে হবে তার সন্তানের কাংখিত ভবিষ্যত।

অর্থাৎ তার সন্তানকে তিনি আগামী জীবনে কী রূপে দেখতে আগ্রহী। অতঃপর সেইরূপে গড়ে ওঠতে হলে তার জীবনে কি কি গুণ ও বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তাও চিহ্নিত করতে হবে। তারপর শুধুই সোহাগ, নির্ঝঞ্ঝাট, আয়েশপূর্ণ নিশ্ছিদ্র আদরের পরিবর্তে পরিমিত মমতা সোহাগ যত্ন ও আদরের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীগুলোও যাতে তার মধ্যে গড়ে ওঠে সে বিষয়েও সতর্ক সচেষ্ট হতে হবে। এক আরবী কবি বলেছিলেন-

তুমি মুক্তি চাও অথচ সে পথে নেই তোমার চেষ্টা-সাধনা

নৌকাতো ভুলেও শুকনোয় চলে না!

লজ্জাবোধ

আদর্শ জীবন গঠনের এক বুনিয়াদি গুণ হলো লজ্জাবোধ। শাসন ও নিয়ন্ত্রণের চালিকা শক্তি হলো লজ্জাবোধ। যার ভিতর এই আলোর বাঁধনটুকু নেই তাকে শাসনের শেকল দিয়ে বেঁধে কখনোই নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। আর এ গুণটির গঠন ও নির্মাণের প্রথম পাঠশালা পরিবার। মা যার প্রধান শিক্ষিকা। তাই প্রতিটি মায়ের কর্তব্য হলো, নির্লজ্জ কোন শব্দ যাতে তার কলিজার টুকরা সন্তানের সুকুমার বৃত্তিকে পবিত্র মনন ও অনুভূতিকে কলুষিত করতে না পারে সে দিকে পূর্ণ সতর্ক দৃষ্টি রাখা। সতর্ক সচেষ্ট থাকা, যাতে কোন নির্লজ্জ ঘাতক কর্ম তার আশার প্রদীপকে নিভিয়ে দিতে না পারে। সেই সাথে কঠোর শাসন ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনতে হবে নিজেদেরকে- বড়দেরকে। কারণ, শিশুদের প্রথম গ্রন্থই হলো তার চারপাশ। সে তার সন্ধানী দৃষ্টি মেলে চারপাশে তাকায় আর যা তার কচি ও অবুঝ মনকে আলোড়িত করে, আকৃষ্ট করে, পরাজিত করে সে তা পূর্ণ যত্ন ও আগ্রহের সাথে লুফে নেয়। অংকিত ও রোপিত হয়ে যায় তার হৃদয় পাতায়। এই অংকুরে লালিত বিশ্বাসই তাকে বয়সে যৌবনে বার্ধক্যে পরিচালিত করে, নিয়ন্ত্রিত করে।

খানা পিনার আদব

শুরুতেই যে মন্দ স্বভাবটি তাড়া করে ফিরে প্রতিটি অংকুরিত মুকুলিত নিষ্পাপ শিশুকে তাহলো লোভ। পুচকে ইদুর ধরনের এই লোভকে সুস্থ তরবিয়তের মাধ্যমে পরিশিলীত করা না গেলে এক সময় এই লোভই এই শিশুকে জাতীয় গাদ্দার, ধোকাবাজ, ঠক ও ভয়ংকর কুমির কিংবা রাক্ষসে পরিণত করে ছাড়ে। তখন নিকটজন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ পর্যন্ত গ্রাস করতে পরোয়া করে না এরা। এক্ষেত্রে মায়েদের প্রধান কর্তব্য হবে, খাবার মায়েরা নিজ হাতে নিয়ন্ত্রণ করবেন। শিশুকে তার নিজ হাতে খাওয়াতে অভ্যস্ত করবেন। অন্যদের সাথে খেতে দিবেন-আগে নয়। যেন অন্যের খাবারের প্রতি হাত না বাড়ায়- বরং অন্যের মুখে খাবার তুলে দিতে উদ্বুদ্ধ করবেন। অতি খাবারের অনিষ্টতার কথা তাকে বার বার বলতে হবে- যাতে উদরপূজারী মানসিকতার অগ্নি তাকে কখনোই স্পর্শ করতে না পারে। সরল সহজ খাবারে অভ্যস্ত করে তুলবেন। যাতে ভবিষ্যতে সরল-সুন্দর জীবনে অভ্যস্ত হতে পারে।

পোশাক-পরিচ্ছদ
শুরু থেকেই অবৈধ-বিজাতীয়, সভ্যতা বিবর্জিত-কুরুচিপূর্ণ পোশাক পরিচ্ছদ থেকে মুক্ত রাখবেন এবং ওসব পোশাকে সজ্জিতজনদের তেতরকার কুৎসিত লোভী ও নোংরা দিকগুলো তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। সেই সাথে ধর্মীয়-দীনী লেবাস-পোশাকের গাম্ভীর্যপূর্ণ শান, সরল- উজ্জ্বল সৌকর্য ও হৃদয় শীতল করা ভাব-মূর্তির কথা তাদের কচি বিশ্বাসের নরোম গতরে সযত্নে এঁকে দিতে হবে- যাতে আজীবন তাদের কচি হৃদয়ের টানেই সে দালাল-টাউটদের পোশাক পরিহার করে ভদ্র ও শালীন সভ্য সুমানুষদের পোষাক পরিচ্ছদে নিজেকে সাজিয়ে রাখে এবং এ জন্যে সদাই লক্ষ্য রাখতে হবে, সে যেন এমন বন্ধুদেরকে কাছে পায় যারা এই সভ্য পোশাকেরই অনুসারী। সেই সাথে তার বৈধ মনোরঞ্জন ও মনতুষ্টির প্রতিও লক্ষ্য রাখতে হবে মাকেই। যাতে বৈধ সাজ-সৌন্দর্য ও শিল্পের ছোঁয়ায় তার পরিচ্ছদ থাকে বরং অন্যদের চাইতেও অধিক দীপ্ত-আলোকিত।

শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে এটা একটা মৌলিক বিষয়। শিক্ষার্থী কিংবা আমাদের সন্তানকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সর্বদাই গভীর নজরে লক্ষ্য রাখতে হবে গৃহিতপন্থা তাকে কতটা প্রভাবিত, তৃপ্ত ও নিয়ন্ত্রিত করছে। এক্ষেত্রে যেমন অতি ছাড়াছাড়ির অবকাশ নেই তেমনি বাড়াবাড়ি এবং কড়াকড়িরও প্রয়োজন নেই। বরং শিশুর বয়স, চাহিদা ও পরিবেশের স্পষ্ট চাহিদা ও পরিবেশের স্পষ্ট ধারাকে বিবেচনায় রেখেই তাকে সুশীল করার ব্যবস্থা নিতে হবে। মধ্যপন্থা-ই হবে যার সরল ঠিকানা।

চাল-চলন, খেলা-ধুলা

স্বাস্থ্য শুধু সুখেরই মূল নয়, জীবন প্রতিষ্ঠার চালিকা শক্তিও। তাই যাতে বদ্ধ অলসতায় শিশুর জীবনকে বরফায়িত করে অকর্মন্যের দুয়ারে নিয়ে দাঁড় করাতে না পারে সেজন্যে রীতিমত কিছু ব্যায়াম, পরিমিত খেলা-ধুলারও সুযোগ দিতে হবে তাদেরকে। সঙ্গে সঙ্গে আলসেমীর ক্ষতি ও কর্মপরায়নতার কল্যানময় দিকগুলোও তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে বয়স মানের ভাষা ও উপস্থাপনায়।

শুরুতেই তাকে বড়-ছোট বলতে যে একটা সামাজিক মৌল ধারা আছে তার সাথেও পরিচিত করে তুলতে হবে তাকে। বড়দের সাথে আচরণ কেমন হবে, বন্ধুদের সাথে হবে কেমন এসব খুঁটি-নাটি বিষয়ও বুঝতে হবে। কথা বলার ধরন, প্রয়োজন ব্যক্ত করা, অপারগতা প্রকাশ করা, পরিচিতজনদের সাথে আচার-আচরণ, অপরিচিতজনদের সাথে কথা বলার রীতিনীতি সম্পর্কেও সজাগ করে তুলতে হবে মায়েকেই। চলার পথে দৃশ্যমান ভালো বিষয়ের প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ ও তার উপকারিতা বর্ণনা, মন্দ কিছু নজরে পড়লে মমতার সাথে তার ক্ষতির দিকগুলো সন্তানকে তার মুকুলিত বয়সেই শিক্ষা দেবেন তার মা।

বসবে কিভাবে, হাঁটবে কিভাবে, প্রস্রাব-পায়খানা কিভাবে করবে, কারো সাথে কথা বললে কি চোখের দিকে তাকিয়ে বলবে না আনতদৃষ্টিতে, সবিশেষ বড়দের সামনে বসতে গেলে বসে বসে পা দুলানো যে বেয়াদবী,কথা বলার সময় আঙ্গুল উচিয়ে চড়াকণ্ঠে কথা বলা যে দৃষ্টিকটু এ কথা শেখাবার দায়িত্বতো মায়েরই।

যথাসম্ভব লুকোচুরির স্বভাব যাতে গড়ে না ওঠে সেদিকে মাকেই লক্ষ্য রাখতে হবে। এও লক্ষ্য রাখতে হবে, শাসনের মাত্রা যেন তাকে মিথ্যা কিংবা ভান-ভণিতার প্রতি তাড়িত না করে।

গল্প শোনানোর অভ্যাস

গল্পের প্রতি শিশু-কিশোরদের আগ্রহ অসীম। তারা বিশেষ করে মা, ফুফু, দাদী-নানীর কাছে গল্প শোনার বায়না ধরে প্রতি রাতেই এবং গল্পের কাহিনী লিখিত পাঠের চাইতেও অনেক বেশি প্রভাবিত করে তাদেরকে। তাই সন্ত ানের মনন ও বিশ্বাসকে পরিপুষ্ট করবে, তার চিন্তা ও স্বপ্নকে আলোকিত করবে, তার ভবিষ্যৎ জীবন ও কর্মকে আলোড়িত করবে সেসব গল্প-কাহিনী ইতিহাসের সমুদ্র থেকে নির্বাচিত করে তা যত্নের সাথে তুলে দিতে হবে সন্ত ানের কানে।

এক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বসহ শোনাতে হবে নবীদের কাহিনী। আল্লাহর জন্যে আল্লাহর দীনের জন্যে তাঁদের ত্যাগ ও সাধনার গল্প শুনিয়ে শোধাতে হবে- বাছাধন! বড় হয়ে তোমাকেও চলতে হবে তাঁদেরই পথে। তাদেরকে আরও শোনাতে হবে সাহাবায়ে কেরামের গল্প; বীর শহীদানের গল্প; নিজে না খেয়ে অন্যদেরকে খাওয়ানোর গল্প; অলি-আউলিয়াদের বিস্ময়কর গল্পও শোনাতে হবে এবং সাহস দিতে হবে- 'চাইলে তুমিও হতে পারবে একদিন বিশ্ববিখ্যাত ওলী।'

শুধু জীবন বাঁচানোই নয়, জীবন দানও যে শ্রেষ্ঠ ইবাদত একথাও তার হৃদয়ে গেঁথে দিতে হবে মাকেই। বড় যত্নের সাথে আল্লাহ ও তাঁর মহান গুণাবলীর কথা শোনাতে হবে- যেন আল্লাহ বিশ্বাসী সুন্দর সুষ্ঠু পরিপক্ক মন নিয়েই পা দিতে পারে সে পরিবারের পাঠশালা পেরিয়ে আনুষ্ঠানিক পাঠশালায়।

একথা পূর্ণ আস্থা দৃঢ়তা ও বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি, কোন মা যদি তার সন্তানকে আনুষ্ঠানিক পাঠশালায় পাঠাবার পূর্বে তার মনন চিন্তা ও হৃদয়কে এসব পবিত্র অনুভূতিতে পূর্ণ করে দেন অতঃপর গভীরভাবে লক্ষ্য রাখেন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা-প্রশিক্ষণ তার সন্তানের স্বভাব-চরিত্র, আচরণ, সভ্যতাকে বিপথগামী করছে কি-না তাহলে তাঁর এই সতর্ক ব্যবস্থা নির্ঘাত তার সন্তানকে সোনার সন্তানে পরিণত করবে; ইতিহাস তাকে স্মরণ করবে স্বর্ণপ্রসবিনী জননী হিসেবেই।
দুঃখ হলো, আজকের মায়েরা শ্রেষ্ঠত্বের এ পথকেই ভুলে গেছে। তারা তাদের ঘরে সোনা ফলাবার সুবর্ণ সুযোগকে পদদলিত করে অন্যের ঘরে গিয়ে সস্তা চাল-ডালের ঘানি টানে। এই দুঃখী দুনিয়ার দুর্দশা ঘুচাতে মায়েদের সন্তানমুখী, ঘরমুখী বিপ্লবের যে বিকল্প নেই- একথা কি বুঝার সময় এখনো হয়নি?
( সংগৃহীত )